ডেইলি স্টার ব্যানার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘অস্থিতিশীলতা না করে সরকারকে তাদের মেয়াদে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া উচিত। ’
আজ সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার ওই আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও এর সুফল পাবে।
বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে পড়েছে। তবে দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান ইতোমধ্যে হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে।’
সরকার আশা করছে, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালটি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ খাতের সংকটও দীর্ঘদিনের বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো কিছু পরিকল্পনা করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।’
সভায় সরকারের কোন কাজ কখন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবায়নের সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়লে এর সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান কেবল ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও যুক্ত।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার সমস্যাগুলো গোপন না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং এগুলোর সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেটিও জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’
সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ উপকৃত হবে।’
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।’
আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে দেশবাসীর কাছেও তা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় কোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।
ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাষ্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাষ্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।
এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।