Daily Star Banner
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহভাবে বেড়ে চলা ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ড্যাব এর সম্মানিত সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ হারুন আল রশীদ ও সম্মানিত মহাসচিব ডাঃ মোঃ জহিরুল ইসলাম শাকিল। এক যৌথ বিবৃতিতে ড্যাব নেতৃত্বে বলেন, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশের চারটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর যে বর্বর ও কাপুরুষোচিত হামলা সংঘটিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমন ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে দেশের সমগ্র স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এক ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে।
ড্যাব নেতৃবৃন্দ আরো বলেন যে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রোজ: বুধবার, রাত ১০টা ৩০ মিনিটে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্রেইন স্ট্রোকজনিত কারণে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনরা জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ মাহমুদা রাণী, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং জরুরী বিভাগে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এমনকি রোগীর স্বজনরা দায়িত্বরত আনসার কমান্ডারকে নির্মমভাবে আঘাত করে তার হাত ভেঙে দেয়।
একই দিন রাতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত এক তরুণকে নিয়ে আসা কয়েকজন যুবক ট্রলিতে রোগী নেওয়াকে কেন্দ্র করে ট্রলিম্যানকে মারধর করেন। দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা ট্রলিম্যানকে উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয় যাতে চারজন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন।
আবার, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মেডিসিন বিভাগের ইউনিট-২ এ কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক ডাঃ মোঃ আল আমিন সিদ্দিকীর ওপর রোগীর স্বজনরা হামলা চালিয়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
সর্বশেষ, গতকাল ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১০টায় পানিতে ডুবে যাওয়া এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনরা কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এর আগে সকাল ০৮টায় মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামে তিন বছরের শিশু রাফি পুকুরে ডুবে গেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয় এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত স্বজনরা ১১ নম্বর মেডিকেল অফিসারের কক্ষসহ হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় ডাঃ আব্দুস সামাদ ও ডাঃ জান্নাতুল রিয়া নামে দুই চিকিৎসক এবং একজন আনসার সদস্যসহ মোট চারজন আহত হন।
ড্যাব নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিনিয়ত নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রতিদান হিসেবে তারা পাচ্ছেন লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও শারীরিক আঘাত। যা কোনো সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তাঁরা আরও বলেন, রোগীর মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক, যা একজন চিকিৎসককেও রোগীর স্বজনদের মতো সমানভাবে ব্যথিত করে। কিন্তু চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ বা অসন্তোষের প্রতিকার আইনই প্রক্রিয়ায় হতে হবে। বিদ্যমান আইনের চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার পাওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো অসন্তোষে আইন হাতে তুলে নিয়ে হাসপাতালের মতো জীবনরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সহিংসতা চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের হামলা কেবল একজন চিকিৎসকের ওপর আক্রমণ নয়, বরং তা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শত শত অসহায় রোগীর জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
ড্যাব নেতৃবৃন্দ সতর্ক করে বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে রোগীদের মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে। তাই নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বজায় রাখাই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
পরিশেষে, ড্যাব নেতৃবৃন্দ উপরোক্ত ধারাবাহিক হামলার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে অবিলম্বে শনাক্ত ও গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ঘটানোর দুঃসাহস না দেখায়। একইসঙ্গে তারা আহত চিকিৎসক, নার্স, আনসার সদস্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, দেশের সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। পরিশেষে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে ভয়ংকর সংকটের হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে “স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।